Monday, January 19, 2026

বিশ্বগুরু" ভাবমূর্তি বনাম কঠোর বাস্তব: ভারতের বিদেশনীতির ব্যর্থতা কি আজ স্পষ্ট?

 বিশ্বগুরু" ভাবমূর্তি বনাম কঠোর বাস্তব: ভারতের বিদেশনীতির ব্যর্থতা কি আজ স্পষ্ট?

বিগত এক দশকে ভারতের রাজনৈতিক মহলে এবং মিডিয়ায় একটি শব্দ বারবার উচ্চারিত হয়েছে— "বিশ্বগুরু"। ২০১৪ সালের পর থেকে প্রচার করা হয়েছে যে ভারত এখন বিশ্বের চালিকাশক্তি এবং প্রধানমন্ত্রী মোদীর নেতৃত্বে ভারতের পাসপোর্টের সম্মান বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে [১, ২]। কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং কৌশলগত অবস্থান বিশ্লেষণ করলে এক ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে, যা প্রচারের থেকে অনেকটাই আলাদা।
আমেরিকার চাপ এবং চাবাহার বন্দরের ভবিষ্যৎ
ভারতের বিদেশনীতির অন্যতম বড় স্তম্ভ হিসেবে দেখা হতো ইরানের চাবাহার পোর্ট (Chabahar Port)-কে। এই বন্দরটি ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ এটি পাকিস্তানকে এড়িয়ে আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া এবং ইউরোপে পৌঁছানোর একটি কৌশলগত পথ হিসেবে কাজ করত [৬, ৭]। ভারত এই প্রকল্পে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার বা ৪৫০০ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করেছে [৬]।
তবে বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন আমেরিকার চাপে ভারত এই বন্দর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসেছে [৮, ৯]। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের কারণে আমেরিকা ভারতের ওপর ২৫% অতিরিক্ত শুল্ক (Tariff) আরোপের হুমকি দিচ্ছে [৫, ৯]। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার ভয়ে ভারতের সরকারি সংস্থা IPGEL-এর ডিরেক্টররা ইতিমধ্যেই পদত্যাগ করেছেন এবং এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে [৮]। এর ফলে ভারতের 'কৌশলগত গভীরতা' (Strategic Depth) বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে [৮, ৯]।
প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্কের অবনতি ও আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা
ভারতের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল যে তারা পাকিস্তানকে বিশ্বজুড়ে একঘরে বা 'আইসোলেট' করে দেবে। কিন্তু বর্তমানে চিত্রটি উল্টো মনে হচ্ছে। গত কয়েক বছরে ভারত তার অনেক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ঘাঁটি হারিয়েছে:
তাজিকিস্তান: আইনি এয়ারবেস (Ayni Airbase), যা ভারত দুই দশক ধরে পরিচালনা করছিল, তা ২০২২ সালে খালি করতে হয়েছে [১৪]।
বাংলাদেশ ও নেপাল: শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাব তীব্র হয়েছে [১৬]। অন্যদিকে নেপাল ক্রমশ চীনের দিকে ঝুঁকছে এবং তিব্বত সীমান্ত দিয়ে চীনের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়াচ্ছে [১৫]।
মালদ্বীপ: মালদ্বীপের বর্তমান সরকার 'ইন্ডিয়া আউট' প্রচার চালিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে দেশ থেকে বের করে দিয়েছে [১৬, ১৭]।
"ইসলামিক ন্যাটো" এবং পাকিস্তানের শক্তিশালী অবস্থান
ভারতের জন্য অন্যতম বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তান, তুরস্ক এবং সৌদি আরবের মধ্যে গড়ে ওঠা একটি নতুন সামরিক জোট, যাকে অনেকে "ইসলামিক ন্যাটো" বলছেন [১৩]। যদি ভবিষ্যতে ভারতের সাথে পাকিস্তানের কোনো সংঘাত বাড়ে, তবে এই চুক্তির ফলে তুরস্ক বা সৌদি আরবের মতো দেশগুলো পাকিস্তানের পাশে দাঁড়াতে বাধ্য থাকবে [১৩]। যেখানে ভারত তার পুরনো বন্ধু এবং মিত্রদের হারাচ্ছে, সেখানে পাকিস্তান ক্রমশ নতুন মিত্র শক্তি বাড়িয়ে চলেছে [১২, ১৪]।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও প্রচারের আড়াল
উৎস অনুযায়ী, যখন ভারতের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান বা বিদেশনীতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে, তখন সরকার প্রায়ই জনগণের নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে [২০]। জিডিপির কাগুজে পরিসংখ্যান এবং "বিশ্বগুরু" প্রচারের আড়ালে সাধারণ মানুষের আয় ও চাকরির অভাব ঢাকা পড়ে যাচ্ছে [১, ১৯]। মুঘল, মন্দির, মসজিদ বা অনুপ্রবেশকারী—এই জাতীয় সাম্প্রদায়িক ইস্যুগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে যাতে মানুষ সরকারের আসল ব্যর্থতাগুলো নিয়ে প্রশ্ন না তোলে [২০, ২১]।
উপসংহার: প্রকৃতপক্ষে কোনো দেশ তখনই বিশ্বশক্তি হয়ে ওঠে যখন তার অর্থনীতি শক্তিশালী হয় এবং সামরিক বাহিনী আধুনিক হয় [১৯]। শুধুমাত্র বিদেশের মাটিতে 'হাউডি মোদী' বা 'নমস্তে ট্রাম্প' অনুষ্ঠান করে বিদেশনীতি সফল হয় না [১০]। ভারত আজ প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে গুরুত্ব হারাচ্ছে এবং আমেরিকার মতো বড় শক্তির চাপের মুখে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে, যা তথাকথিত "বিশ্বগুরু" তকমার সাথে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় [১০, ১৮]।

No comments:

Post a Comment

Powered by Blogger.