Showing posts with label pinaki. Show all posts
Showing posts with label pinaki. Show all posts

Saturday, August 23, 2025

মিথ্যাচারের বেড়াজাল: বাংলাদেশের ইতিহাসে দানবীয়করণ প্রকল্প এবং সত্যের মুক্তি

 এখানে বাংলাদেশের ইতিহাসের কিছু প্রচলিত মিথ ও মিথ্যাচার নিয়ে একটি বিস্তারিত লেখা দেওয়া হলো:


**মিথ্যাচারের বেড়াজাল: বাংলাদেশের ইতিহাসে দানবীয়করণ প্রকল্প এবং সত্যের মুক্তি**



বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘমেয়াদী এবং বিষাক্ত অধ্যায় হলো **দানবীয়করণ প্রকল্প**। এই প্রকল্পটি প্রাথমিকভাবে ভারতের একটি কৌশল ছিল, যার লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা ও জনগণকে দানব হিসেবে উপস্থাপন করা, যেন পৃথিবীর সামনে ভারতই পাকিস্তানের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বকারী। দুঃখজনকভাবে, এই কৌশলটি পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ এই ভারতীয় শিক্ষাকে আত্মস্থ করে পাকিস্তানের প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর জন্য একটি 'বিষাক্ত মূর্খ বাহিনী' তৈরি করেছে। আর আশ্চর্যজনকভাবে, আজকেও এই একই মিথ্যাচারের প্রকল্প বিএনপি বহন করে চলেছে।


সূত্র মতে, ভারতের একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছিল পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং জনগণকে 'দুষ্টু, বিভ্রান্ত, দুর্নীতিগ্রস্ত' হিসেবে চিত্রিত করা। এমনকি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতো একজন বিরল রাজনৈতিক নেতাকেও তারা দানবীয় হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এই **'পাকিস্তানিদের ডেমোনাইজেশন' (দানবীয়করণ)** একটি ভারতীয় প্রকল্প, যা তারা আওয়ামী লীগকে খুব ভালোভাবে শিখিয়েছে। আওয়ামী লীগ 'পাখি বীরজহ' (পাকিস্তানি বীর্যজাত) এর মতো ঘৃণামূলক স্লোগান ব্যবহার করে পাকিস্তানি বিদ্বেষ ছড়ায়, যদিও শেখ মুজিবুর রহমান স্বয়ং পাকিস্তানের নাগরিক ছিলেন। মেঘমাল্লার মতো ব্যক্তিরাও এই ঘৃণার অংশীদার, যদিও তাদের পূর্বপুরুষরা পাকিস্তান আমলেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। যারা পাকিস্তানের অস্তিত্ব রক্ষায় কাজ করেছে, এমনকি যারা ছাত্র ইউনিয়ন বা মুজিববাদী ছাত্রলীগও ছিল, তাদেরও পরে পাকিস্তানি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অথচ, পাকিস্তান খারাপ কাজ করেনি তা নয়, কিন্তু যে কাজটা তারা করেনি, তার দায় চাপানো অন্যায়।


**বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের কবরের মিথ্যাচার উন্মোচন**


এই **মিথ্যাচারের সবচেয়ে জঘন্যতম দৃষ্টান্তগুলির মধ্যে একটি হলো বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের কবর নিয়ে প্রচলিত গল্প**। ১৯৭১ সালের ২০শে আগস্ট পশ্চিম পাকিস্তানের করাচির মাশরুর বিমান ঘাঁটিতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা নিয়ে এই মিথ্যাচার। মতিউর রহমান, যিনি তখন একজন ইন্সট্রাক্টর ছিলেন, একজন তরুণ পাকিস্তানি ট্রেনি পাইলট রশিদ মিনহাজের সাথে একটি T-33 প্রশিক্ষণ বিমানে (যা যুদ্ধবিমান নয়) উড়ছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল বিমানটি নিয়ে ভারতের দিকে যাওয়া। রশিদ মিনহাজ যখন মতিউর রহমানের আসল উদ্দেশ্য বুঝতে পারেন, তখন ককপিটের ভেতরে ধস্তাধস্তি হয়, যার ফলে বিমানটি বিধ্বস্ত হয় এবং দুজনেই মারা যান। এই ঘটনায়, বিমান ভারতে নিয়ে যাওয়া ঠেকাতে জীবন দেওয়ায় পাকিস্তান রশিদ মিনহাজকে তাদের সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক পদক 'নিশানে হায়দার' প্রদান করে, আর বাংলাদেশ মতিউর রহমানকে 'বীরশ্রেষ্ঠ' খেতাব দেয়। এই পর্যন্ত ইতিহাসে উভয় পক্ষই একমত। ২০০৬ সালে বেগম খালেদা জিয়ার অনুরোধে মতিউর রহমানের মৃতদেহ পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়। বেগম জিয়া তার মরদেহ আসার জন্য বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন। **কিন্তু এই ঘটনাকে ঘিরে একটি জঘন্য মিথ্যা গল্প প্রচলিত করা হয়েছে যে, পাকিস্তানিরা নাকি মতিউর রহমানের কবরের ফলকে লিখে রেখেছিল 'ইধার সোরাহায় এক গাদ্দার' (এখানে এক বিশ্বাসঘাতক শুয়ে আছে)**।


এই মিথ্যাচার বিএনপির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজেও ছড়ানো হয়েছে, যেখানে মতিউর রহমানকে 'বেঈমান' হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। অথচ, যেই বিএনপি মতিউর রহমানের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনেছিল, তারা কি তার কবর দেখেননি? **প্রকৃতপক্ষে, মতিউর রহমানের মাশরুর বিমান ঘাঁটির কবরের ফলকে আরবিতে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' এর নিচে লেখা ছিল: 'নাম্বার ওয়ান র‍্যাংক ফ্লাইট, নাম মতিউর রহমান, মৃত্যু তারিখ ২০শে আগস্ট ১৯৭১'**। সেখানে 'গাদ্দার' শব্দটি কোথাও লেখা ছিল না। পাকিস্তানিরা তাকে সম্মানের সাথে দাফন করেছিল, যা মার্বেল পাথরের ফলকেই প্রমাণিত। **বিএনপির মতো একটি বিশাল দল এমন ডাহা মিথ্যাচার ছড়ালে তাদের দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা কঠিন হবে**।


**অন্যান্য ঐতিহাসিক মিথ ও সত্যের উন্মোচন**


মতিউর রহমানের কবরের মিথ্যার মতো আরও অনেক ঐতিহাসিক মিথ্যাচার বাংলাদেশে প্রচলিত। যেমন:

*   যে ছবিটিকে বলা হতো 'পাকিস্তানি সেনারা লুঙ্গি খুলে খতনা পরীক্ষা করছে', সেটি আসলে একজন ভারতীয় ফটোগ্রাফার কিশোর পারে'র তোলা ভারতীয় সেনাবাহিনীর ছবি ছিল, যা ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশে প্রবেশের সময় ধারণ করা হয়েছিল।

*   আমেরিকা একতরফাভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল—এই মিথও ভাঙ্গা হয়েছে।

*   ইসলামপন্থী আলেমরা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন—এই মিথও ভাঙ্গা হয়েছে।

*   রাজাকারদের দাড়ি-টুপি ছিল এবং তারা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরতো—এই মিথও ভাঙ্গা হয়েছে।

*   ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল—এই মিথও ভাঙ্গা হয়েছে।

*   দেশ ভাঙ্গার জন্য মুসলিম লীগ দায়ী—এই মিথও ভাঙ্গা হয়েছে।

*   ১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ শহীদ হয়েছিল—এই মিথও ভাঙ্গা হয়েছে।

*   ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, পাকিস্তানি শোষণ নিয়েও অনেক মিথ্যাচার ছিল, যা একে একে ভাঙ্গা হয়েছে।


বক্তা উল্লেখ করেছেন যে তিনি নিজে একসময় এসব বিশ্বাস করতেন, কিন্তু সত্যের মুখোমুখি হয়ে হতবিহ্বল হয়েছেন এবং প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন, যার ফলস্বরূপ এসব মিথ্যে উন্মোচিত হয়েছে। তার মতে, বামপন্থীরা তার ক্ষমতা সম্পর্কে অবগত থাকায় তাকে থামানোর চেষ্টা করেছিল, কারণ তিনি তাদের 'দুর্গ' ধ্বংস করছেন।


**মিথ্যার শেকল ভেঙে সত্যের পথে**


মিথ্যাচার হলো ক্ষমতার সবচেয়ে সহজ অস্ত্র। যখন সত্যকে পরাজিত করা যায় না, তখন শত্রুকে দানবীয় করে তোলা হয়। ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে প্রকল্প শুরু করেছিল, আওয়ামী লীগ তা আত্মস্থ করেছে এবং আজ বিএনপি তা বহন করে চলেছে। কিন্তু **মিথ্যার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি ইতিহাসের বোঝা বহন করতে পারে না; একসময় তা ভেঙ্গে পড়ে এবং তার শূন্যতা উন্মোচিত হয়**। আমরা এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে সত্য ও মিথ্যার সংঘাত আগামীর বাংলাদেশের রূপ নির্ধারণ করবে। যদি আমরা মিথ্যার শিকল ভেঙ্গে সত্যকে গ্রহণ করি, তবে আমাদের রাজনৈতিক কল্পনা হবে মুক্ত। অন্যথায়, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরেও আমরা প্রকৃত মুক্তি পাবো না। আমাদের এই যাত্রা কেবল পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারতের ইতিহাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার এক অনন্ত সংগ্রামের অংশ। **মিথ্যার রাজনীতির অবসান ঘটানোই আমাদের মুক্তির প্রথম ধাপ**।

Tuesday, August 19, 2025

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মৌলবাদ বিতর্ক: একটি পশ্চিমা বয়ান এবং দেশীয় বাস্তবতার বিশ্লেষণ

 **বাংলাদেশের রাজনীতিতে মৌলবাদ বিতর্ক: একটি পশ্চিমা বয়ান এবং দেশীয় বাস্তবতার বিশ্লেষণ**


সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে 'মৌলবাদ' শব্দটি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, বিশেষ করে তারেক রহমানের এক বক্তব্যের পর, যা খালেদা জিয়ার পূর্ববর্তী অবস্থানের বিপরীত বলে প্রতীয়মান হয়। ইন্ডিয়া টুডে এবং এমনকি বাংলাদেশের বামপন্থীরাও মনে করে যে মৌলবাদ দেশের জন্য একটি বড় বিপদ। কিন্তু এই 'মৌলবাদ' শব্দটির উৎস এবং পশ্চিমা বিশ্বে এর ব্যবহার নিয়ে গভীরতর বিশ্লেষণ প্রয়োজন, কারণ এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে কীভাবে প্রভাবিত করছে তা বোঝা জরুরি।


**'মৌলবাদ' শব্দের উৎস ও বিবর্তন**

'মৌলবাদ' বা 'ফান্ডামেন্টালিজম' শব্দটির উৎপত্তি ইসলামে নয়, বরং ২০ শতকের শুরুর দিকে আমেরিকায় প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান ধর্মের মধ্যে। ১৯১০ থেকে ১৯১৫ সালের মধ্যে প্রকাশিত "দা ফান্ডামেন্টালস" নামক পুস্তিকা সিরিজে বাইবেলকে আক্ষরিক অর্থে মানার ওপর জোর দেওয়া হয়। তখন 'ফান্ডামেন্টালিস্ট' বলতে বাইবেলকে অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণকারী রক্ষণশীল খ্রিস্টানদের বোঝানো হতো।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, বিশেষ করে আমেরিকার প্রেক্ষাপটে, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে 'ফান্ডামেন্টালিজম' শব্দটিকে নিজেদের ধর্মের ভেতরের সাংস্কৃতিক বিরোধ হিসেবে দেখা হয়। খ্রিস্টান মৌলবাদকে অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে রাখলেও, ইসলামিক মৌলবাদকে ভিন্নভাবে চিত্রিত করা হয়। **আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে 'ফান্ডামেন্টালিজম' ধীরে ধীরে একটি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত শব্দে রূপান্তরিত হয়, যা পশ্চিমা বিশ্বে বিশেষ করে ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর ইসলামকে কেন্দ্র করে 'ইসলামিক ফান্ডামেন্টালিজম' হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে**।


**কেন ইসলামকে টার্গেট করা হলো?**

পশ্চিমা বিশ্ব বিংশ শতাব্দীতে ইসলামের নামে কোনো রাষ্ট্র বিপ্লবের কথা কল্পনাও করেনি, কিন্তু ইরানে তা ঘটে। এছাড়াও, ক্রুসেড এবং অটোমান সাম্রাজ্যের কাছে পরাজয়ের ঐতিহাসিক স্মৃতি পশ্চিমের মননে ইসলামকে **সবসময় একটি চ্যালেঞ্জার সভ্যতা** হিসেবে তুলে ধরেছে। ১৬ শতকে ভিয়েনা অবরোধের মতো ঘটনাগুলো ইউরোপীয় সভ্যতাকে মনে করিয়ে দেয় যে ইসলাম সামরিক ও সাংস্কৃতিকভাবে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী। ভিয়েনা ছিল ইউরোপে প্রবেশের দরজা, এবং এই অবরোধ ব্যর্থ হওয়ায় ইউরোপিয়ানরা এটিকে সভ্যতার রক্ষা হিসেবে স্মরণ করে।


আধুনিক যুগে অটোমান সাম্রাজ্য না থাকলেও এবং ইসলামী শক্তি বিভক্ত থাকলেও, পশ্চিমের মনে **ইসলামের পুনর্জাগরণ বা বিপ্লবের একটি আশঙ্কা** কাজ করে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, পশ্চিমা সভ্যতা তাদের কিছু অমীমাংসিত মৌলিক সমস্যার সমাধান দিতে পারেনি, যেমন:

*   **বৈষম্য:** পুঁজিবাদী সমাজে ধনী-গরিবের বৈষম্য ক্রমাগত বেড়েছে।

*   **ব্যক্তি বিচ্ছিন্নতা:** পশ্চিমা সভ্যতা ব্যক্তি স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ করেছে, কিন্তু সমাজ, কমিউনিটি ও পরিবার ভেঙে গেছে, ফলে মানুষ একা, বিচ্ছিন্ন ও বিষণ্নতায় ভোগে.

*   **যুদ্ধের অনিবার্যতা:** পশ্চিমা ধারণার 'ব্যালেন্স অফ পাওয়ার' স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারেনি, যার প্রমাণ দুটি বিশ্বযুদ্ধ, স্নায়ুযুদ্ধ এবং বর্তমানের বিভিন্ন যুদ্ধ।

*   **পরিবেশ ধ্বংস:** প্রকৃতি ও পরিবেশকে ভোগের বস্তু মনে করার কারণে পরিবেশগত বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তন হয়েছে।


**ইসলাম একটি বিকল্প সভ্যতাগত প্রস্তাবনা?**

এই সমস্যাগুলোর সমাধানের বিকল্প হিসেবে ইসলামকে একটি সভ্যতাগত প্রস্তাবনা হিসেবে দেখা যেতে পারে। ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো হাজির করে, যা পশ্চিমা গণতন্ত্র, উদারবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার বাইরে একটি আদর্শগত বিকল্প। কিছু ক্ষেত্রে ইসলাম বিকল্প দেয়:

*   **অর্থনীতি:** ন্যায়সঙ্গত সম্পদ বন্টনের ব্যবস্থা দেয়, যেখানে সম্পদ এক জায়গায় জমা থাকে না।

*   **সমাজ:** ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে ভারসাম্য রেখে সমাজকেন্দ্রিক জীবন ধারণার প্রস্তাব দেয়, পরিবার ও উম্মাহর ধারণা মানুষকে সম্পর্কিত করে রাখে।

*   **নৈতিক রাজনীতি:** রাষ্ট্রকে কেবল আইনের মেশিন হিসেবে না দেখে নৈতিক দায়িত্বশীলতার কেন্দ্র মনে করে; ক্ষমতাকে 'আমানত' হিসেবে দেখে, যেখানে জবাবদিহিতা কেবল জনগণের কাছে নয়, খোদার কাছেও।

*   **শান্তি ও যুদ্ধ:** যুদ্ধকে কেবল আত্মরক্ষা ও নিপীড়ন বন্ধের জন্য বৈধ করে, আধিপত্য নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য।

*   **প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক:** প্রকৃতিকে আমানত হিসেবে দেখে, শোষণের বস্তু নয়; মানুষ প্রকৃতির শাসক নয়, বরং রক্ষক।


**'ইসলামিক ফান্ডামেন্টালিজম' কেন একটি রাজনৈতিক অস্ত্র?**

পশ্চিমা রাষ্ট্রতন্ত্র ইসলামকে একটি আদর্শগত বিকল্প হিসেবে দেখে, তাই একে প্রতিরোধ করার জন্য 'ইসলামিক ফান্ডামেন্টালিজম' শব্দ ব্যবহার করে ইসলামকে **পিছিয়ে পড়া, অযৌক্তিক ও সহিংস** হিসেবে চিত্রিত করে। মুসলিম রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোকে 'ফান্ডামেন্টালিস্ট' হিসেবে চিহ্নিত করে আন্তর্জাতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য করা হয় এবং তাদের দমনকে বৈধতা দেওয়া হয়।


লক্ষ্যণীয় যে, খ্রিস্ট ধর্ম বা হিন্দু ধর্মে মৌলবাদ থাকলেও, তা ভিন্নভাবে দেখা হয়। খ্রিস্টান ফান্ডামেন্টালিজমকে অভ্যন্তরীণ ধর্মতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব হিসেবে সীমিত অর্থে ব্যবহার করা হয় এবং সন্ত্রাস বা হুমকির সাথে যুক্ত করা হয় না। কিন্তু ইসলামের ক্ষেত্রে এটিকে 'বাইরের শত্রু', 'সভ্যতার চ্যালেঞ্জ' এবং 'আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য হুমকি' হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কার্ল শ্মিট ও ফুকোর ধারণার মতো, পশ্চিমা রাষ্ট্রতন্ত্র 'ইসলামিক ফান্ডামেন্টালিজম' ধারণাটিকে **শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য** ব্যবহার করে। এডওয়ার্ড সাইদের 'ওরিয়েন্টালিজম' ধারণাও ব্যাখ্যা করে কিভাবে পশ্চিমা সংস্কৃতি নিজেকে আধুনিক প্রমাণ করতে 'অপর' তৈরি করে।


**বিএনপি'র কৌশল ও পরিণতি**

ভিডিওতে বলা হয়েছে যে, বিএনপি পশ্চিমা বয়ানকে কাজে লাগিয়ে ইসলাম প্রসঙ্গে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ জামাতকে মোকাবেলা করতে চায়। জামাতের দুর্বল দিক, অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের মাঠে, তাদেরকে ঘায়েল করতে বিএনপি 'মৌলবাদ' ও 'জঙ্গিবাদ' এর বয়ান ব্যবহার করছে, যা অনেকটা আওয়ামী লীগের বয়ানেরই প্রতিধ্বনি।


তবে, ভিডিওর বক্তার মতে, বিএনপি জামাতের সাথে অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চায়, কর্মী সংখ্যায়, রাজনৈতিক মানে বা নৈতিক শিক্ষায় কোনো তুলনাতেই দাঁড়াতে পারে না। বিএনপির বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার অভাব থাকায় তারা সহজ পথ বেছে নিয়েছে - মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে জামাতকে কোণঠাসা করা।


এই রাজনীতি বিএনপির জন্য পরাজয়ের পথ তৈরি করবে। **বাংলাদেশের মানুষ কোনো আমদানি করা প্রেসক্রিপশন চায় না, বরং চায় নিজেদের ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র**। পশ্চিমা শক্তি হাসিনা-বিরোধী লড়াইয়ে কোনো সাহায্য করেনি, বরং হাসিনাকেই সমর্থন দিয়ে গেছে।


যদি বিএনপি পশ্চিমা শক্তির ইচ্ছায় বা আওয়ামী লীগের 'কপি-পেস্ট' রাজনীতি অনুসরণ করে, তবে বাংলাদেশের মানুষ তাদের প্রত্যাখ্যান করবে। **বাংলাদেশের রাজনীতির বড় ট্র্যাজেডি হলো নিজেদের শক্তি ও ঐতিহ্যকে ভরসা না করে বিদেশি প্রেসক্রিপশন আঁকড়ে ধরা**। আওয়ামী লীগ যেমন বছরের পর বছর ধরে এটি করেছে, বিএনপিও একই পথে হাঁটলে পরিণতি একই হবে।


**বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনীতি**

ভিডিওর শেষাংশে বলা হয়েছে যে, 'মৌলবাদ' নামের কৃত্রিম আতঙ্ক দেখিয়ে জনগণকে ভয় দেখানো গেলেও ক্ষমতা দখল করা যায় না। বাংলাদেশের মানুষ চায় নিজেদের ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের ভিত্তিতে একটি ন্যায়ভিত্তিক, বিশ্বাস ও মূল্যবোধ নির্ভর রাষ্ট্র।


**যদি বিএনপি আওয়ামী লীগের সহজ পথ অনুসরণ না করে বরং নিজের কণ্ঠে, নিজের বয়ানে, নিজের আত্মপরিচয়কে রাজনৈতিক ভিত্তি করে তোলে, তবে এই জাতি তার পক্ষেই আবার জেগে উঠবে**। কিন্তু যদি তারা পশ্চিমের সাজেশন ও আওয়ামী লীগের 'কপি-পেস্ট' রাজনীতিতে হারিয়ে যায়, তবে জাতি তাদের ক্ষমা করবে না এবং ইতিহাসের আদালতে তাদের নাম আত্মসমর্পণকারী বা পরাজিতদের তালিকায় লেখা থাকবে।


বাংলাদেশ আজ নতুন দিগন্ত চায়; আওয়ামী বা পশ্চিমা কণ্ঠস্বর নয়, বরং নিজের সত্যিকারের কণ্ঠস্বর যে দল শোনাবে, সেই দলই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়বে। এটি ২০২৪ সালের বর্ষা বিপ্লবের অঙ্গীকার ছিল এবং বাংলাদেশ সেই পথেই হাঁটবে।

Powered by Blogger.