ইসরায়েল, ভারত এবং কাহুটার সেই রহস্যময় রাত: একটি না বলা গল্প
মানুষের জীবন বড়ই অদ্ভুত। মাঝে মাঝে এমন সব ঘটনা ঘটে যা থ্রিলার উপন্যাসের পাতাকেও হার মানায়। জানালার বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে, হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে বসে ভাবছি সেইসব জটিল রাজনৈতিক মারপ্যাঁচের কথা, যা সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালেই থেকে যায়। আজ তেমনই এক রহস্যময় গল্পের ঝুলি খুলে বসা যাক।
গল্পের শুরুটা কিন্তু আজকের নয়। সাংবাদিক হামিদ মীর সাহেব, যাঁর খবরাখবর বেশ কদর পায়, তিনি সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। পাকিস্তান যখন গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে লড়তে তাদের সেনা পাঠাতে অসম্মতি জানালো, তখন থেকেই নাকি ভারত ও ইসরায়েলের পুরনো জোট আবারও নড়েচড়ে বসেছে [১], [২]। ইসরায়েল হয়তো ভেবেছিল পাকিস্তান তাদের কথামতো কাজ করবে, কিন্তু ইসলামাবাদ থেকে আসা ‘শাট আপ কল’ তাদের হতাশ করেছে [২], [৩]। আর এই হতাশা থেকেই নাকি পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রোগ্রামের বিরুদ্ধে নতুন কোনো ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হচ্ছে [১], [৪]।
তবে এই ষড়যন্ত্রের শিকড় অনেক গভীরে, সেই ১৯৮০-র দশকে। তখন ইসরায়েল আর ভারত মিলে পাকিস্তানের কাহুটা পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলার এক দুঃসাহসী ছক কষেছিল [৪], [১১]। অনেকটা যেমন তারা ইরাকের ওসরাক নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর গুঁড়িয়ে দিয়েছিল 'অপারেশন ব্যাবিলন'-এর মাধ্যমে [৪], [১১]। ভারতের জামনগর বা উধমপুর এয়ারবেস ব্যবহার করে ইসরায়েলি F-15 আর F-16 বিমানে করে সেই হামলার নীল নকশা তৈরি ছিল [৮], [১১]। হিন্দুত্ববাদী নেতারা অনেক সময় বলেন, ইন্দিরা গান্ধীর শেষ মুহূর্তের দ্বিধার কারণেই নাকি পাকিস্তান আজ পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হতে পেরেছে [৬], [৯]। কিন্তু পর্দার আড়ালের গল্পটা কি অন্য কিছু ছিল?
হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের সেই চতুর ‘মিসির আলী’র মতো পাকিস্তানের গোয়েন্দারাও তখন এক দারুণ বুদ্ধির খেলা খেলেছিলেন। সূত্র বলছে, পাকিস্তানের এই ‘নিঞ্জা টার্টলস’রা (গোয়েন্দারা) আগে থেকেই জানতেন ইসরায়েলিরা কী করতে যাচ্ছে [১২], [১৩]। তারা একজন পলাতক পাকিস্তানি পাইলটকে ব্যবহার করে ইসরায়েল আর ভারতকে মিথ্যে তথ্যের গোলকধাঁধায় ফেলে দিয়েছিলেন [১৩], [১৮]। মেজর আমির নামের এক গোয়েন্দা এবং তার এক বন্ধু, যে ছদ্মবেশে রেন্ট-এ-কার ব্যবসা করত, তারা মিলে ইসরায়েলি এজেন্টদের এমনভাবে ঘোল খাইয়েছিলেন যে তারা যা বিশ্বাস করতে চেয়েছিল, পাকিস্তান তাদের তাই বিশ্বাস করিয়েছিল [১৬], [১৭], [১৮]। একেই বলে চোরের ওপর বাটপাড়ি!
যখন ইসরায়েলি বিমানগুলো ওড়ার জন্য প্রায় প্রস্তুত, ঠিক তখনই ইন্দিরা গান্ধী পিছু হটেন। কেন জানেন? কারণ পাকিস্তান থেকে এক গোপন বার্তা পাঠানো হয়েছিল— "আমরা জানি তোমরা কী করতে যাচ্ছ" [১৯]। শুধু তাই নয়, ডক্টর আব্দুল কাদির খান সাহেবের বয়ান অনুযায়ী, তখনকার পাকিস্তানি নেতৃত্ব নাকি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, ইসরায়েলে পারমাণবিক অস্ত্র পৌঁছে দিতে তাদের কোনো অত্যাধুনিক মিসাইলের প্রয়োজন নেই; তারা নাকি গাধার পিঠে চড়িয়েই তেল আবিব উড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে [২০]। এমন অদ্ভুত কিন্তু কার্যকর হুমকি শুনে ইসরায়েলিরা আর পঙ্গা নেওয়ার সাহস পায়নি [২০]।
মানুষের মন বড় বিচিত্র। ভারতের অনেক সাধারণ মানুষ হয়তো মনে করেন তাদের গোয়েন্দা সংস্থা র (RAW) সবজান্তা, আবার কেউ হয়তো ভাবেন মোসাদ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ [৭], [১৮]। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এমন অনেক মোচড় থাকে যা আমাদের কল্পনার অতীত। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বারবার প্রমাণ করেছে যে, তারা এই দাবার বোর্ডে অন্যদের চেয়ে কয়েক চাল এগিয়ে থাকতে জানে [২১]।
বৃষ্টিটা এখন বেশ বেড়ে গেছে। জানালার কাঁচ ঝাপসা হয়ে আসছে। ভাবছি, সত্য আসলে কী? সত্য কি তাই যা আমরা দেখি, নাকি যা আমাদের দেখানো হয়? হয়তো কোনো এক নিঝুম রাতে কাহুটার সেই পাহাড়গুলো আজও ফিসফিস করে সেই পুরোনো জয়ের গল্প শোনায়, যা পৃথিবীর মানচিত্রকে বদলে দিতে পারত।

No comments:
Post a Comment